- 'আমি কি জানালার পাশে বসতে পারি?'
- 'জি? এটা তো আমার সিট।'
- 'এটা আপনার সিট আমি জানি। কিন্তু আমি বাস জার্নিতে আমার বমি হয়।'
আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলাম ভদ্রলোক বলে কি? কী বিশ্রী বিষয়! আজ পর্যন্ত আমি পুরুষদের মধ্যে বাসে বমি করে এমন লোক দেখিনি। মনে মনে একটু বিরক্ত ও হলাম। এতোদূর যাব ভেবে জানালার পাশে বসে হাওয়া খেতে খেতে যাবো। কিছুই হলো না।
বসার পর থেকেই ভদ্রলোক রেডিও ৯৮.৪ হয়ে গেছেন। বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। আমি বিরস বদনে উত্তর দিচ্ছি। লোকটা পানও খাচ্ছে। ভুরভুর করে জর্দার গন্ধ নাকে থাবড়া দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে কষে একটা থাপ্পড় দিয়ে দিই।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাচ্ছি বোনের কাছে। আমার বোন লতা প্রেগন্যান্ট। দুলাভাই ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে। ঘরে ওর শাশুড়ী ছাড়া কেউ নেই, আর আমিও বেকার। বোনের বাড়ি থাকবো কিছুদিন। দুলাভাইয়ের দেশে ফিরতে দেরী হবে আর বোনের প্রয়োজন অপ্রয়োজনে বাসায় একজন পুরুষ মানুষ দরকার এসময়। সেজন্যই ঢাকা যাচ্ছি। এই হতাশা ভরা জীবন থেকে আমারও কিছু মুক্তি মিলবে। কিন্তু এই মূর্তিমান সমস্যা থেকে কবে মুক্তি মিলে স্বয়ং বিধাতা জানেন।
লোকটা তার পরিবার, তার ব্যবসা সব সম্পর্কে বলে ফেলছে গড়গড় করে। গাড়ি মিরসরাই এসে পড়েছে।
- 'জানেন ভাই, আমার স্ত্রী মিরসরাইয়ের মানুষ। আমাদের বিয়ে হয়েছিল কিভাবে জানেন?'
- 'কিভাবে?'
- 'প্রেম করতাম আমরা। ওর বাপে জোর করে বিয়ে দিচ্ছিল। তুইলা নিয়া বিয়া করছি।'
- 'তাহলে তো অনেক ভালোবাসেন ভাবীকে। ছেলেমেয়ে কজন আপনার?'
- 'পাঁচ ছেলে, দুই মেয়ে।'
- 'ভালোই তো ভালোবেসেছেন ভাবীকে তাহলে। তা বিয়ের ক বছর হলো? কি করেন আপনি?'
- 'এই তো তিন বছর হলো।'
- 'তিন বছরে সাতটা বাচ্চা! ইয়ার্কি করছেন না তো?'
- 'আমার স্ত্রী খুব শখ ছিলো বাচ্চার। ঘর ভর্তি বাচ্চা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে। আর সে সুখী সুখী চেহারা নিয়ে ওদের ধমকাবে। তাই, আমি প্রতি বছর দু তিনটা বাচ্চা নিই। আমি ব্যবসায়ী। মাশাআল্লাহ টাকা পয়সার অভাব নেই।'
- 'ফাজলামো করছেন। বছরে দু'তিনটা বাচ্চা নেন মানে? বছরে মানুষের দুই তিনটা বাচ্চা হয় নাকি? গাঁজাখুরি যত্তসব!'
লোকটার মুখের হাসিটা যেন একটু নিভে গেল। পরক্ষণেই গালভর্তি হাসি দিয়ে বললো,
- 'আমি বাচ্চা দত্তক নিই। এই যে এখন যাচ্ছি, এটা হলে আমাদের পরিবারে ছোট এবং আট নম্বর সন্তান হবে। ভাই দোয়া রাখবেন আমাদের জন্য।'
- 'আপনার নিজের সন্তান নেই?'
- 'ছি ছি! কি বলছেন? এরা আমার নিজেরই সন্তান। আমি কখনো এদের পর ভাবিইনি।'
- 'আমি সেটা বলিনি, মানে আপনার বায়োলজিক্যাল সন্তানের কথা বলছি।'
- 'প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই আমার স্ত্রী মারা গেছেন।'
কথাটা শুনেই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এখন তার জর্দার গন্ধ আমার চারপাশে মৌ মৌ সুগন্ধি ছড়াচ্ছে।

0 Comments