টানা চার ঘন্টা পরীক্ষার দেওয়ার পর আমি আর আমার এক ফ্রেন্ড ছুটলাম কম্পিউটার দোকানে। ফর্ম ফিলাপের আগে অনলাইন কপি তুলতে হবে। দোকানে গিয়ে ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত জরাজীর্ণ দেহটাকে নিয়ে ধপাস করে বসে গেলাম  একটা চেয়ারে। আচমকা শব্দে দোকানে বসা লোকটা ভয় পেয়ে গেলো৷  ওনাকে আমার রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার বলতে বলতে চোখ গেলো দোকান বরাবর রাস্তার ওই পাশে। একটা ছেলে চানাচুর মাখানোর সরঞ্জামাদি নিয়ে বসছে। বয়স বড়জোর ষোলো কি সতেরো হবে। পড়াশোনা করলে ইন্টারমিডিয়েট ১ম বর্ষে পড়তো হয়তো। কিছুক্ষণ বাদে বাদে কলেজ গেইটের দিকে তাকাচ্ছে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। এই দীর্ঘশ্বাস যেন অনেক কিছু বলতে চায়। ফ্রেন্ডের ধাক্কায় সম্বিত ফিরে পেলাম।  ও ফিসফিস করে বললো,


" কোথায় হারালি রূপন্তি? ওনি সেই কখন থেকে তোকে ডেকে চলেছে তোর ফোন নাম্বার বলার জন্য। তোর তো কোনো খবরই নেই।"


আমি লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে ফোন নাম্বার বললাম। যাবতীয় কাজ শেষ করে দু'জনেই দোকান বেরোলাম। পা বাড়ালাম সেই ছেলে দিকে। আমার ফ্রেন্ড হাত টেনে ধরে বললো,


" আবার কোথায় যাচ্ছিস তুই? এমনিতেই চার টার উপরে বাজে।"


ওই ছেলের দিকে ইশারা করে বললাম, 


"চানাচুর মাখা খাবি?"


ও আমার দিকে ভ্রুকুটি করে জবাব দিলো,


" এখন তুই এসব খাবি। এমনিতেই তো অনেক ক্লান্ত।"


" আয় না প্লিজ। টাকা আমি দিবো।"


ও অসহায় চাহনি দিয়ে বললো,


" তাইলে তুই খা দুস্ত। আমি এখন বাসায় গিয়ে আবার টিউশন যাবো।রাগ করিস না প্লিজ।"


অগত্যা ওকে বিদায় দিয়ে আমি একাই চললাম। গিয়ে ছেলেটাকে বললাম দশ টাকার চানাচুর মাখা দেওয়ার জন্য। ও পেঁয়াজ কুচি করতে লাগলো। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, 


" পড়াশোনার প্রতি এতো টান থাকলে করো না কেন পড়াশোনা?"


ওর হাত থেমে গেলো। কিয়ৎকাল স্থির থেকে ছেলেটা আবার পেঁয়াজ  কুচোঁতে লাগলো। কোনো প্রকার উত্তর না পেয়ে আবারও বললাম, 


" কি হলো উত্তর দিচ্ছো না যে।"


ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে প্রাণহীন হাসলো। ঝুপড়ি থেকে দুই মুঠ চানাচুর কৌটায় রাখতে রাখতে উত্তর দিলো,


" আপা যাদের বাপ থাকে না তাদের যে পড়াশোনা করতে বারন। বাপ থাকা মানেই অনেক কিছু। বিভিন্ন রকম ঝড়ঝাপটা থেকে এই বাপ নামক বৃক্ষই বাঁচায়।"


এতোটুকু বলে ছেলেটার মুখটা মলিন হয়ে গেলো। আমি ওই মলিন মুখের দিকেই তাকিয়ে আছি আরো কিছু শোনার জন্য। সে বললো, 


" আব্বা যে বছর রোড এক্সিডেন্টে মা'রা গেছে। সেবছর আমি ক্লাস এইটে পড়ি। ট্রাক ড্রাইভার মাতাল হয়ে ট্রাক চালাচ্ছিলো। আর প্রা'ণ দিলো আমার বাপ। আম্মা এই শোক সইতে না পেরে স্ট্রো'ক করলো। জমানো যা টাকা ছিলো সব আম্মার চিকিৎসায় খরচ হয়ে করলাম। আমার আর জেএসসি পরীক্ষা দেওয়া হলো না। ঘরে ছোট একটা বোন আর মা। আজ চার বছর চানাচুর বিক্রির টাকায় কোনো রকম দিন যায়। সেখানে তো পড়াশোনা বিলাসিতা আপা।"


" তোমরা কোনো বিচার বা ক্ষতিপূরণ চাওনি?"


সে চানাচুরের কৌটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে উত্তর দিলো,


"এসব আন্দোলন বড়লোকদের জন্য। গরীবরা দূ'র্ঘ'ট'নায় ম'র'লে বড়জোর খবরের কোণায় নাম থাকে এই আরকি। আর ক্ষতিপূরণ দিয়া কি করমু? আমার বাপ কি আর ফেরত আসবো? আমরা দুই ভাই বোন তো এতিমই হয়ে গেলাম।"


আমার পিছনে কয়েকজন ছেলে এই কলেজেই পড়ে। সিগারেট খাচ্ছে আর সেই ধোঁয়া আকাশ পানে উড়িয়ে দিচ্ছে। ওদের দিকে ইশারা করে বললাম, 


"দেখতে পাচ্ছো?"


"হুম আপা দেখছি।"


ওকে বাজিয়ে দেখার জন্য বললাম, 


" ভালো হয়েছে পড়াশোনা করো না। না হলে ওদের মতো বখে যেতে।কি দরকার পড়াশোনা করে ভালো মানুষ না হওয়া যায়।"


" ভুল কইলেন আপা। মায়ের যেমন বিকল্প নাই তেমনি পড়াশোনারও বিকল্প নাই। আপনে যা জ্ঞান আহরন করবেন সব আপনারই থাকবো। আপনার জ্ঞানের আলো আপনি ছড়িয়ে দিতে পারবেন কিন্তু আপনার জ্ঞান আপনার থেকে একেবারে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আর এদের কথা কইতাছেন? আপা আগাছা পরগাছা তো সব জায়গায় থাকে,  মনে করেন এগুলোও তেমন আগাছা। সবাই যদি মানুষ হতো তাহলে তো হতোই।"


মনযোগ দিয়ে ছেলেটার কথা শুনছি। কি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে। ইচ্ছে আছে পড়াশোনা করার কিন্তু সামর্থ্য নেই। ছেলেটা চানাচুর মাখানোর ঠোঙ্গা আমার হাতে দিয়ে বলে,


"সবাই স্বপ্ন দেখে আপা। কিন্তু সবার সব স্বপ্ন কি পূরণ হয়? আমার স্বপ্নটাও তেমন। বাপ ম'রার সাথে সাথে আমার স্বপ্নও ম'রে গেছে।"


 ঠোঙ্গা হাতে রাস্তা পাড় হলাম। পুরো আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে। অপেক্ষা করছি বাসের জন্য। আর লক্ষ্য করছি ছেলেটাকে।সে বার বার কলেজ গেইটেই তাকাচ্ছে।  ওই ছেলেটার পাশেই দাঁড়ানো সেই ছেলে গুলো সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে।  বাস এসে পড়ায় ওঠে পড়লাম বাসে। বাসে বসার মিনিট দুয়েক পরে ছাপিয়ে বৃষ্টি নামলো। সিটে বসা মাত্রই আমি ভাবছি কিছুক্ষন আগে অবলোকন হওয়া দৃশ্যের কথা।  কেউ অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না। ছোট্ট একটা কাজ অবলম্বন করে দিন পাড় করছে।  আর কেউ সকল সুযোগ সুবিধা পেয়েও ঠিকমতো পড়াশোনা না করে বাবার টাকা উড়াচ্ছে। এ যেন একই পথে দুটি ভিন্ন গল্প। 


অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে আর বাস চলছে আপন গতিতে।  আজ আর বৃষ্টি থামবে বলে মনে হয় না। আচ্ছা ওই ছেলেটা কি আজ আর চানাচুর বিক্রি করতে পারবে?  নাকি না খেয়ে রাত্রিযাপন করবে দুই ভাই বোন আর মা?


_____________সমাপ্ত__________